শবেকদর কবে?

 শবেকদর কবে?

ভূমিকা :

রমজান মাসের শেষ দশকের বেজোড় সংখ্যা রাত্রে গুলোতে শবে কদর অনুসন্ধান করা মুস্তাহাব। মহানবী সা: এর অনুসন্ধানে উক্ত রাত্রি গুলিতে বড় মেহনত করতেন। রমজানের শেষ দশক এসে উপস্থিত হলে আল্লাহর রাসূল সা: ইবাদতের জন্য নিজের কোমর বেঁধে নিতেন, সারা রাত্রি জাগরণ করতেন এবং আপন পরিজন কেউ জাগাতেন। 



তাছাড়া শবে কদরের সন্ধানে ও আশায় তিনি ঐ শেষ দশকের দিবারাত্রে ইতিকাফ করতেন। আসুন আমরা দেখি শবে কদর কি? তার কদর কতটুকু? এবং তার আহকাম কি? 

শবে কদরের নাম শবে কদর কেন? 

আরবিতে 'লাইলাতুল ক্বদর'- এর ফারসী, উর্দু, হিন্দী ও বাংলাতে অর্থ হলো শবে ক্বদর।আরবিতে 'লাইলাহা' এবং ফার্সিতে 'শব' শব্দের মানে হলো রাত। কিন্তু 'ক্বদর শব্দের মানে বিভিন্ন হতে পারে। আর সেজন্যই এর নামকরণের কারণও বিভিন্ন। যেমন :-

১.ক্বদর মানে তাকদীর। সুতরাং লাইলাতুল ক্বদর বা শবে ক্বদরের মানে ত;কদীরের রাত বা ভাগ্য রজনী। যেহেতু এই রাতে মহান আল্লাহ আগামী এক বছরের জন্য সৃষ্টির রুযী, মৃত্যু ও ঘটনাঘটনের কথা লিপিবদ্ধ করে থাকেন। যেমন তিনি একথা কোরআনে বলেন, 

অর্থাৎ, এই রজনীতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয় (কুরআনুল কারীম  ৪৪:৪)

আর এই তকদীর ;যা বাৎসরিক বিস্তারিত আকারে লিখা হয়। এছাড়া মাতৃগর্ভে ভ্রূণ থাকা অবস্থায় লিখা হয় সারা জীবনের তকদীর।আর আদি তকদীর ; যা মহান আল্লাহ আসমান -জমিন সৃষ্টি করার ৫০ হাজার বছর পূর্বে 'লাওহে মাহফূয '- এ লিখে রেখেছেন। 

২.ক্বদরের আর একটি অর্থ হল,ক্বদর, শান, মর্যাদা, মাহাত্ম্য ইত্যাদি। যেমন বলা হয়ে থাকে, সমাজে অমুকের বড় কদর আছে। অর্থাৎ, তার মর্যাদা ও সম্মান আছে। অতএব এ অর্থে শবে কদরের মানে হবে মহীয়সী রজনী। 

৩.উক্ত কদর যে রাত জেগে ইবাদত করে তারই। এর পূর্বে যে কদর তার ছিল না, রাত জেগে শবে কদর পাওয়ার পর আল্লাহর কাছে সে কদর লাভ হয় এবং তার কাছে তার সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি হয়। আর তার জন্য একে শবে কদর বলে। 

৪.ওই কদরের রাতে আমলেরও বড় কদর ও মাহাত্ম্য রয়েছে। সেজন্যও তাকে শবে কদর বলা হয়। 

৫.কদরের আর এক মানে হল সংকীর্ণতা। এ রাতে আসমান থেকে জমিনে এত বেশি সংখ্যক ফেরেশতা অবতরণ করেন যে, পৃথিবীতে তাঁদের জায়গা হয় না। বরং তাঁদের সমাবেশের জন্য পৃথিবী সংকীর্ণ হয়। তাই এ রাতকে শবে কদর বা সংকীর্ণতার রাত বলা হয়। 

শবে কদরের মাহাত্ম্য :

১.শবে কদরের রয়েছে বিশাল মর্যাদা ও মাহাত্ম্য। মহান আল্লাহর এই রাতে কুরআন অবতীর্ণ করেছেন এবং সে রাতের মাহাত্ম্য ও ফজিলত বর্ণনা করার জন্য কুরআন মাজিদের পূর্ণ একটি সূরা অবতীর্ণ করেছেন এবং সেই সূরার নামকরণ ও হয়েছে তারই নামে। মহান আল্লাহ বলেন, ان انزلناه في ليله القدر ،وما ادرك ما ليله القدر ،ليله القدر خير من الف شهر 

অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আমি ঐ কুরআনকে শবে কদরে অবতীর্ণ করেছি। তুমি কি জানো, শবে কদর কি? শবে কদর হল হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। (কুরআনুল কারীম ৯৭:১-৩)

এক হাজার মাস সমান ৩০ হাজার রাত্রি। অর্থাৎ এই রাত্রের মর্যাদা ৩০,০০০ গুণ অপেক্ষাও বেশি! সুতরাং বলা যায় যে, এই রাত্রের একটি তসবি অন্যান্য রাত্রের ৩০,০০০ তসবী অপেক্ষা উত্তম। অনুরূপ এই রাত্রের ১ রাকাত নামায অন্যান্য রাত্রের ৩০,০০০ রাকাত অপেক্ষা উত্তম। 

বলা বাহুল্য, এই রাত্রের আমল শবে কদর বিহীন অন্যান্য ৩০ হাজার রাতের আমল অপেক্ষা অধিক শ্রেষ্ঠ। সুতরাং যে ব্যক্তি এই রাতে ইবাদত করল, আসলে সে যেন ৮৩ বছর ৪ মাস অপেক্ষাও বেশি সময় ধরে ইবাদত করল। 

২.শবে কদরের রাত হল মুবারক রাত, অতি বরকতময়, কল্যাণময় ও মঙ্গলময় রাত। মহান আল্লাহ বলেন, انا انزلناه في ليله مباركات 

অর্থাৎ, আমি এ কুরআনকে বরকতময় রজনীতে অবতীর্ণ করেছি। (কুরআনুল কারীম ৪৪:৩)

উক্ত বরকতময় রাত্রি হল 'লাইলাতুল ক্বদর ' বা শবে কদর। আর শবে কদর নিঃসন্দেহে রমাযানে।বলা বাহুল্য, ওই রাত্রে শবে বরাতের রাত্রি নয় ;যেমন অনেকে মনে করে থাকে এবং ওই রাত্রে বৃথা মনগড়া ইবাদত করে থাকে। কারণ, কুরআন (লাওহে মাহফুয থেকে) অবতীর্ণ হয়েছে রমযান মাসে। কুরআন বলে,, شهر رمضان الذي انزل فيه القران 

অর্থাৎ, রমাদান মাস ; যে মাসে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে।(কুরআনুল কারীম ২:১৮৫)

আর তিনি বলেন, انا انزلناه في ليله القدر 

অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আমি ওই কোরআনকে শবে কদরে অবতীর্ণ করেছি (কোরআনুল কারীম ৯৭:১-৩)

আর এ কথা বিদিত যে, শবে কদর হলো রমযানে ;শাবানে নয়। 

৩.এই রাত সেই ভাগ্য -রাত ; যাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয়।(কুরআনুল কারীম ৪৪:৪)

৪.এটা হল সেই রাত ;যে রাতে প্রত্যেক কাজের জন্য ফিরিশতাকুল  তাঁদের প্রতিপালকের আদেশে অবতীর্ণ হন। অর্থাৎ, যে কাজের ফায়সালা ঐ রাতে করা হয় তা কার্যকরী করার জন্য তাঁরা অবতরণ করেন। মহান আল্লাহ বলেন, 

৫. এ রাত হল সালাম ও শান্তির রাত। এছাড়াও মহান আল্লাহ বলেন, 

সে রজনী ফজর উদয় পর্যন্ত শান্তিময়। 

পূর্ণ রাত্রের শান্তিতে পরিপূর্ণ ;তার মধ্যে কোন প্রকার অশান্তি নেই। রাত্রি জাগরনকারী মমিন নারী-পুরুষের জন্য এ হলো শান্তির রাত্রি। শয়তান তাদের মাঝে কোন প্রকার অশান্তি আনয়ন করতে পারে না। অথবা সে রাত্রি হলো নিরাপদ। শয়তান সে রাত্রে কোন প্রকার অশান্তি ঘটাতে পারে না। অথবা সে রাত হলো সালামের রাত। এড়াতে অবতীর্ণ ফিরিশতাকুল ইবাদতকারী মুমিনদেরকে সালাম জানায়। 

৬.এ রাত্রি হল কিয়াস্থাপিত ম ও গুনাহ -খাতা মাফ করাবার রাত্রি। মহানবী (সা:)- বলেন, " যে ব্যক্তি ঈমান রেখে ও নেকি লাভের আশা করে শবে কদরের রাত্রি কিয়াম করে ( নামায পড়ে) , সে ব্যক্তির পূর্বেকার গুনাহ সমূহ মাফ হয়ে যায়। 

বলা বাহুল্য, এ রাত্রি হলে ইবাদতের রাত্রে। এ রাত্রি ধুমধাম করে পান - ভোজনের, আমোদ -খুশীর রাত্রি নয়।আসলে যে ব্যক্তি এ রাত্রের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়, সেই সকল প্রকার কল্যাণ থেকে বঞ্চিত। 

শবেকদর কোন রাতটি?

রমজান মাসের শেষ দশকের যেকোনো একটি রাত্রি শবে কদরের রাত্রি। একদা মহানবী ( সা:)- শবেকদরের অন্বেষণে রমাযানের প্রথম দশকে ইতিকাফ করলেন। অতঃপর মাঝের দশকে ইতিকাফ করে ২০শের ফজরে বললেন, "আমাকে শবেকদর দেখানো হয়েছিল; কিন্তু পরে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। অতঃপর তোমরা শেষ দশকের বিজোর রাত্রে তা অনুসন্ধান কর।আর আমি দেখেছি যে, আমি পানি ও কাঁদাতে সিজদা করছি তাই। " অতঃপর ২১শের রাত্রিতে বৃষ্টি হয়েছিল। অতএব সে বছরে ঐ ২১শের রাতেই শবেকদর হয়েছিল। 

পূর্বোক্ত হাদিসের ইঙ্গিত অনুসারে শেষ দশকের বিজোড় রাত্রিগুলোতে শবে কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশী।সুতরাং  ২১, ২৩, ২৫, ২৭, ও ২৯ এই ৫ রাত হল শবেকদর হওয়ার অধিক  আশাব্যঞ্জক রাত। অবশ্য এর মানে এই নয় যে, বিজোর রাত্রি ছাড়া জোর  রাত্রিতে শবে কদর হবে না। বরং শবেকদর জোড়- বিজোড় যেকোনো রাত্রিতেই হতে পারে। তবে বিজোর রাতে শবে কদর সংঘটিত হওয়াটাই অধিক সম্ভাবনাময় ও আশাব্যঞ্জন। 

শেষ দশকের মধ্যে শেষ সাত রাত্রিগুলো অধিক আশাব্যঞ্জন। মহানবী (সা:) বলেন, " আমি দেখছি যে,  তোমাদের সবারই স্বপ্ন শেষ সাত রাতের ব্যাপারে একমত হয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তি শবেকদর অনুসন্ধান করতে চায়, সে যেন শেষ সাত রাতগুলিকে করে। 

অবশ্য এর অর্থ যদি 'কেবল  ঐ বছরের রমযানের শেষ সাত রাতের কোন এক রাতে শবেকদর হবে ' হয় এবং তার অর্থ ' আগামী প্রত্যেক রমযানে হবে' না হয় তাহলে। কারণ এরূপ অর্থ হওয়ার সম্ভাবনাও নাকচ করা যায় না। তাছাড়া যেহেতু মহানবী (সা:)- তাঁর শেষ জীবন অবধি রমাযানের শেষ দশকের পুরোটাই ইতিকাফ করে গেছেন এবং এক বছর শবেকদর ২১শের রাত্রিতেও হয়েছে - যেমনে কথা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। 

শেষ দশকের বিজোড় রাত্রি গুলোর মধ্যে ২৭শের রাত্রি শবেকদরের জন্য অধিক আশাব্যঞ্জন। কেননা, উবাই বিন কাব (রা:) 'ইনশাআল্লাহ ' না বলেই কসম খেয়ে বলতেন, 'শবেকদর রাত্রি হল ২৭ শের রাত্রি ; ঐ রাত্রিতে কিয়াম করতে আল্লাহর রাসূল (সা:) আমাদেরকে আদেশ করেছেন। 

অনুরূপভাবে মুয়াবিয়া (রা:)- মহানবী (সা:)- এর নিকট থেকে বর্ণনা করে বলেন,  '২৭ শের রাত্রি হল শবে কদরের রাত্রি। '

কিন্ত ঐ রাতে হওয়াই জরুরি নয়। কারণ, এ ছাড়া অন্যান্য হাদিস রয়েছে, যার দ্বারা বুঝা যায় যে, শবেকদর  অন্য তারিখের রাতেও হয়ে থাকে। 

বলাবাহুল্য, শবে কদরের রাত প্রত্যেক বছরের জন্য একটি মাত্রই রাত নয়। বরং তা বিভিন্ন রাত্রে সংঘটিত হতে পারে। সুতরাং কোন বছরে ২৯শে, আবার কোন বছরে ২৪শের রাতেও শবেকদর হতে পারে। আরে এই অর্থে শবে কদর প্রসঙ্গে বর্ণিত সমস্ত হাদিসের মাঝে পরস্পর বিরোধিতা দূর হয়ে যাবে। 

শবে কদর একটি নির্দিষ্ট রাত না হয়ে এক এক বছরে শেষ দশকের এক এক রাতে হওয়ার পশ্চাতে হিকমত এই যে, যাতে অলস বান্দা কেবল একটি রাত জাগরণ ও কিয়াম করে ক্ষ্যান্ত না হয়ে যায় এবং সেই রাতের মর্যাদা ও ফজিলত এর উপর নির্ভর করে অন্যান্য রাতে ইবাদত ত্যাগ না করে বসে। পক্ষান্তরে অনির্দিষ্ট হলে এবং প্রত্যেক রাতের মধ্যে যেকোনো একটি রাতের শবে কদর হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে বান্দা শেষ দশকের পুরোটাই কিয়াম ও ইবাদত করতে আগ্রহী হবে। আর এতে রয়েছে তারই লাভ। 

ঠিক হুবহু একই যুক্তি হল মহানবী (সা:)- এ হৃদয় থেকে শবেকদর (তারিখ)  ভুলিয়ে দেওয়ার পিছনে। আর এতে রয়েছে সেই মঙ্গল ; যার প্রতি ইঙ্গিত করে মহানবী (সা:)- বলেছেন, " আমি শবেকদর সম্বন্ধে তোমাদেরকে খবর দেওয়ার জন্য বের হয়ে এলাম। কিন্তু অমুক ও অমুকের কলহ করার ফলে শবে কদরের সে খবর তুলে নেওয়া হল। এতে সম্ভবত :তোমাদের জন্য মঙ্গল আছে। সুতরাং তোমরা নবম, সপ্তম, এবং পঞ্চম রাত্রে তা অনুসন্ধান কর।

শবেকদরের  সওয়াব অর্জনের জন্য শবেকদর কোন রাতে হচ্ছে তা জানা বা দেখা শর্ত নয়। তবে ইবাদতের রাত্রে শবেকদর সংঘটিত হওয়ার এবং তার অনুসন্ধানে সওয়াবের আশা রাখা শর্ত। শবে কদর কোন রাতে ঘটছে তা জানা যেতে পারে। আল্লাহ যাকে তাওফিক দেন, সে বিভিন্ন লক্ষণ দেখে শবে কদর বুঝতে পারে। সাহাবাগণ (রা:)- একাধিক নিদর্শন দেখে জানতে পারতেন শবেকদর ঘটার কথা। তবে তা জানা বা দেখা না গেলে যে তার ছোয়াব পাওয়া যাবে না -তা নয়। বরং যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশা রেখে সে রাত্রিতে এবাদত করবে, সেই তার সবের অধিকারী হবে ;চাহে শেষ শবে কদর দেখতে পাক বা না- ই পাক। 

বলা বাহুল্য, মুসলিমের উচিত, সওয়াব নেকি অর্জনের উদ্দেশ্যে মহানবী (সা:)- এর আদেশ ও নির্দেশমত রমযানের শেষ দশকের শবেকদর অন্বেষণ করতে যত্নবানও আগ্রহী হওয়া। অতঃপর দশটি রাতে ঈমান ও নেকির আশা রাখার সাথে ইবাদত করতে করতে যে কোন রাতে যখন শবেকদর লাভ করবে, তখন সে সেই রাতের অগাধ সওয়াবের অধিকারী হয়ে যাবে ; যদিও সে বুঝতে না পারে যে, ঐ দশ রাতের মধ্যে কোন রাত্রি শবে কদর রূপে অতিবাহিত হয়ে গেল। মহানবী  (সা:)- বলেন, "যে ব্যক্তি ঈমান রেখে ও নেকি লাভের আশা করে শবে কদরের রাত্রে কিয়াম করে ( নামাজ পড়ে) , সে ব্যক্তির পূর্বেকার গুনাহসমূহ মাফ হয়ে যায়। অন্য এক বর্ণনায় আছে, " যে তার খোঁজে কিয়াম করল এবং সে তা পেতে তৌফিক লাভ করল তার পূর্বেকার গুনাহ সমূহ মাফ হয়ে গেল। আরেকটি বর্ণনায় আছে, ' যে ব্যক্তি শবে কদরে কিয়াম করবে এবং সে তার ঈমান অনেকের আশা রাখার সাথে পেয়ে যাবে, তার গুনাহ সমূহ মাফ হয়ে যাবে। 

আর এসব সেই ব্যক্তির ধারণাকে খন্ডন করে, যে মনে করে যে, যে ব্যক্তি শবে কদর মনে করে কোন রাতে কিয়াম করবে, তার শবে কদরের সোয়াব লাভ হবে ; যদিও সে রাতে শবেকদর না হয়। 




শবেকদরের আলামত সমূহ :

শবেকদরের কিছু আলামত আছে যা রাতের মধ্যেই দেখা যায় এবং আর কিছু আলামত আছে যা রাতের পরে সকালে দেখা যায়। যেসব আলামত রাতে পরিলক্ষিত হয় তা নিম্নরূপ :-

১. শবেকদরের রাতের আকাশ Investment উজ্জ্বল থাকে। অবশ্য এ আলামত শহর বা গ্রামের ভিতর বিদ্যুতের আলোর মাঝে থেকে লক্ষ্য করা সম্ভব নয়। কিন্তু যারা আলো থেকে দূরে মাঠে ময়দানে থাকে, তারা সে ঔজ্জ্বল্য লক্ষ্য করতে পারে। 

২.অন্যান্য রাতের তুলনায় শবেকদরের রাতে মুমিন তার হৃদয়ে এক ধরনের প্রশস্ততা, স্বস্তি ও শান্তি বোধ করে। 

৩. অন্যান্য রাতের তুলনায় মুমিন শবেকদরের রাতে কিয়াম বা নামাজে অধিক মিষ্টতা অনুভব করে। 

৪. এই রাতে বাতাস নিস্তব্ধ থাকে। অর্থাৎ, সে রাতে ঝড়ও বা জোরে হাওয়া চলে না। আবহাওয়া অনুকূল থাকে। মহানবী (সা:)- বলেন, "শবেকদরের রাত উজ্জ্বল। "অন্য এক বর্ণনায় তিনি বলেন,  নাতিশীতোষ্ণ ; না ঠান্ডা, না গরম। 

৫. শবে কদরের রাতে উল্কা ছুটে না। 

৬. এ রাতে বৃষ্টি হতে পারে। মহানবী  ( সা:)- বলেন, " আমাকে শবে কদর দেখানো হয়েছিল ; কিন্তু পরে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। অতএব তোমরা শেষ দশকের বিজোড় রাত্রে তা অনুসন্ধান করো। আর আমি দেখেছি যে, আমি পানি ও কাঁদাতে সিজদা করছি। " অতঃপর ২১শের রাত্রিতে সত্যই বৃষ্টি হয়েছিল। 

৭. শবে কদর কোন নেক বান্দা স্বপ্নের মাধ্যমেও দেখতে পারেন। যেমন কিছু সাহাবা তা দেখেছিলেন। 

পক্ষান্তরে যেসব আলামত রাতের পরে সকালে দেখা যায় তা হল এই যে, সে রাতের সকালে উদয় কালে সূর্য হবে সাদা ; তার কোন কিরণ থাকবে না। অথবা ক্ষীণ রক্তিম  অবস্থায় উদিত হবে ; ঠিক পূর্ণিমার রাতের চাঁদের মত। অর্থাৎ, তার রশ্নি চারিদিকে বিকীর্ণ হবে না। 

আর লোকমুখে যেসব আলামতের কথা প্রচলিত ; যেমন : সে রাতে কুকুর ভেকায় না বা কম ভেকায়, গাছপালা মাটিতে নুয়ে পরে আল্লাহকে সিজদা করে, সমুদ্রের লবণাক্ত পানি মিঠা হয়ে যায়, নূরের ঝলকে অন্ধকার জায়গা আলোকিত হয়ে যায়, নেক লোকেরা ফেরেশতার সালাম শুনতে পান ইত্যাদি আলামত সমূহ কাল্পনিক। এগুলো শারয়ী দলিল দ্বারা প্রমাণিত নয়। তাছাড়া এসব কথা নিশ্চিত রূপে অভিজ্ঞতা ও বাস্তববিরোধী। 




শবেকদরের দুআ: 

মা আয়েশা ( রা:)- কর্তিক বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল!  আমি শবেকদর লাভ করলে তাতে কি দোয়া পাঠ করব? 

উত্তরে তিনি বললেন, "তুমি বলো, 

اللهم انك عفوا تحب عفوا فوني 

উচ্চারণ :- আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন  তুহিব্বুল আকুয়া, ফা'ফু আন্নী।

অর্থ :- হে আল্লাহ!  নিশ্চয়ই তুমি ক্ষমাশীল, ক্ষমা কে পছন্দ কর। অতএব তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। 


উপসংহার :

শবে কদর এমন এক মহিমান্বিত রাত, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। তবে এই রাত নির্দিষ্ট কোনো তারিখে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আল্লাহ তাআলা তা রমজানের শেষ দশকের বিভিন্ন বিজোড় রাতে গোপন রেখেছেন—যাতে বান্দা কেবল একটি রাতের উপর নির্ভর না করে পুরো দশক জুড়ে ইবাদত, কিয়াম, দোয়া ও তওবার মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করে। এ গোপনীয়তার মধ্যেই রয়েছে মহান হিকমত ও বান্দার জন্য অশেষ কল্যাণ।

শবে কদরের আলামত সম্পর্কে কিছু সহীহ নিদর্শন থাকলেও মূল বিষয় হলো—ঈমান ও সওয়াবের আশা নিয়ে আন্তরিকভাবে ইবাদত করা। তাই আমার মনে হয় কেউ নির্দিষ্টভাবে রাতটি জানতে পারুক বা না-ই পারুক, যদি সে খালিস নিয়তে কিয়াম ও দোয়ায় রত থাকে, তবে সে অবশ্যই এই রাতের অগাধ ফজিলতের অংশীদার হবে। যেমন মহানবী (সা.) ঘোষণা করেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশা রেখে শবে কদরে ইবাদত করবে, তার পূর্বের গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে।

অতএব,আমার, আপনার এবং আমাদের প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য হলো রমজানের শেষ দশকে বিশেষভাবে যত্নবান হওয়া, গাফিলতি ত্যাগ করা এবং বেশি বেশি দোয়া, ইস্তিগফার ও কুরআন তিলাওয়াতে মনোযোগী হওয়া। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে শবে কদরের বরকত ও রহমত লাভ করার তাওফিক দান করুন। আমীন। 


এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

ড্রিমিক্স আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url