ফিতরা কত টাকা ২০২৬ বাংলাদেশ
ভূমিকা : আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। আজ আমি আপনার সাথে এমন একটি বিষয়ে আলোচনা করতে চাচ্ছি, যা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাদাকাতুল ফিতর' কে ' যাকাতুল ফিতর' বলা হয়। ' সাদাকাহ' শব্দটি শরয়ী পরিভাষায় ফরজ যাকাতের অর্থে ব্যবহৃত। আর এ ব্যবহার কুরআন ও হাদিসে বহু জায়গায় পরিলক্ষিত হয় । পক্ষান্তরে ' ফিতরা' মানে হল, রোযা ছাড়া।
সুতরাং ' যাকাতুল ফিতর '- এর মানে হল, সে যাকাত ; যা রমজানের রোজা ছাড়ার কারণে ফরজ হয়। একে 'যাকাতুল ফিতরা ' ও বলা হয়। 'ফিতরাহ' মানে প্রকৃতি । যেহেতু এ যাকাত আত্মশুদ্ধি ও আত্মার আমল কে নির্মল করার জন্য দেওয়া ওয়াজিব,তাই এর নাম যাকাতুল ফিতরা।
সাদাকাতুল ফিতরার মান :
ফিতরার যাকাত আদায় করা ফরজ। আল্লাহর রাসূল (সা:)- এ যাকাত কে মুসলিম উম্মাহর জন্য ফরজ করেছেন। ইবনে উমার (রা :)- বলেন, " আল্লাহর রাসূল (সা:)- মুসলিমদের স্বাধীন ও ক্রীতদাস, পুরুষ ও নারী এবং ছোট ও বড় সকলের জন্য এক সা' ( প্রায় আড়াই কেজি) খেজুর বা যব খাদ্য ( আদায়) ফরজ করেছেন।
সাদাকাতুল ফিতরার হিকমত :
সাদাকাতুল ফিতর সন দুই হিজরীর শাবান মাসে বিধিবদ্ধ হয়। এ সদাকাহ ফরজ করা হয় রোজাদারকে সেই অবাঞ্চনীয় অসারতা ও যৌনাচারের মৌলিকতা থেকে পবিত্র করার জন্য, যা সে রোজা অবস্থায় করে ফেলেছে। এই সদাকা হবে তার রোজার মধ্যে ঘটিত ত্রুটির সংশোধনী। যেহেতু নেকীর কাজ পাপকে ধ্বংস করে দেয়।
এ সদাকা ফরজ করা হয়েছে, যাতে সেই ঈদের খুশি ও আনন্দের দিনে গরিব -মিসকিনদের সহজলব্ধ আহার হয়। যাতে তারাও ধনীদের সাথে ঈদের আনন্দে শরিক হতে পারে। যারা আজ আনে কাল খায়, যাদের ভিক্ষা করে দিন পার হয়,একমুঠো খাবারের জন্য যাদেরকে লোকের দ্বারস্থ হতে হয়, তাদেরকে অন্ততপক্ষে ঈদের দিনটাতেও যেন লাঞ্ছিত হতে না হয় এবং ঘরে খাবার দেখে যাতে মনের ভিতর খুশির ঢেউ আসে, তার জন্যই সমাজবিজ্ঞানী দ্বীন দরদি দ্বীনের নবী (সা:)- এই সুব্যবস্থা করে গেছেন।
এই শেষোক্ত হিকমতের জন্য নিফাসবতী ও ছোট শিশু অরোজদারের উপরেও উক্ত সদাকাহ ফরজ করা হয়েছে। ইবনে আব্বাস (রা:)- বলেন, ' আল্লাহর রাসূল (সা:)- রোজাদারের অসারতা ও যৌনাচারের পঙ্কিলতা থেকে পবিত্রতা এবং মুসলিমদের আহার স্বরূপ ফরজ করেছেন।
যেমন এই সদাকা আদায় করতে হয় মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ; যেহেতু তিনি রোজাদারকে পূর্ণ একমাস রোজা রাখার তাওফিক দান করেছেন।
ফিতরার সদাকাহ হল দেহের যাকাত। যেহেতু মহান আল্লাহ এই দেহকে একটি বছর অবশিষ্ট রেখেছেন এবং নিরাপত্তা ও সুস্থতা হেন নেয়ামত বান্দাকে দিয়ে রেখেছেন।
ফিতরার যাকাত ফরজ করা হয়েছে আনুগত্যের মাসের শেষে ; যাতে আত্মশুদ্ধির প্রক্রিয়া পরিপূর্ণ হয়। যেহেতু আল্লাহর আনুগত্যের কাজ করে এবং নিষিদ্ধ জিনিস বর্জন করে আত্মা বিশুদ্ধ ও পবিত্র হয়। তদনুরূপ মাল খরচ করলেও পবিত্রতা লাভ হয়। আর এজন্যই মাল দানকে 'যাকাত ' ( পবিত্রতা) বলা হয়।
ফিতরা কার উপরে ওয়াজিব :
ফিতরার যাকাত প্রত্যেক সেই মুসলিমের উপর ফরজ, ঈদের রাত ও দিনে যারা একান্ত প্রয়োজনীয় এবং নিজের তথা তার পরিবারের আহারের চেয়ে অতিরিক্ত খাদ্য মজুদ থাকে। আর এ ফরজের ব্যাপারে সকল ব্যক্তিত্ব সমান। এতে স্বাধীন ও ক্রীতদাস, পুরুষ ও নারী, ছোট ও বড়, ধনী ও গরিব, শহরবাসী ও মরুবাসী এবং রোজাদার ও অরোজাদারের মাঝে কোন পার্থক্য নেই। এক কথায় এ যাকাত সকলের তরফ থেকে আদায়যোগ্য।
এ সদাকা ফরজ হওয়ার জন্য যাকাতের নিসাব হওয়া শর্ত নয়। যেহেতু তা ব্যক্তির উপর ফরজ, মালের উপর নয়। মালের সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই এবং মাল বেশি হলে তার পরিমাণ বেশিও হয় না। বলা বাহুল্য, এ সদাকাহ কাফফারার মত ; যা ধনী - গরিব সকলেই আদায় করতে বাধ্য। যেমন -" প্রত্যেক স্বাধীন ও ক্রীতদাস বান্দার জন্য "( বুখারী ১৫০৪,মুসলিম ৯৮৪ নং) হাদিসের এই শব্দও ধনী-গরীব সকলের জন্য ব্যাপক ; চাহে সে নিসাবের মালিক হোক অথবা না হোক।
আবূ হুরাইরা (রা:)- বলতেন, ( ফিতরার যাকাত ফরজ ) প্রত্যেক স্বাধীন ও ক্রীতদাস, পুরুষ ও নারী, ছোট ও বড়, গরিব ও ধনীর উপর।
পক্ষান্তরে মহানবী (সা:)- এর হাদিস, " ধনী অবস্থা ছাড়া কোন সদাকাহ নেই। " এর অর্থ হল, মালের সাদাকাহ। আর ফিতরার যাকাত খাস দেহাত্মার সদাকাহ।
ফিতরার সদাকাহ আদায় করার জন্য মূল সম্পদ ; যেমন:- জমি-জায়গা, আসবাব - পত্র এবং মহিলার ব্যবহারের অলংকার বিক্রয় করা জরুরি নয়। অবশ্য যে জিনিস তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত এবং যা বিক্রয় করা সম্ভব, তা বিক্রয় করে ফিতরার সদাকা আদায় করা ওয়াজিব। যেহেতু মৌলিক কোন ক্ষতি ছাড়া তা আদায় করা সম্ভব। সুতরাং যেমন প্রয়োজনের অতিরিক্ত উদ্ধৃত খাদ্য - সামগ্রী থাকলে আদায় করতে হতো, তেমনি অতিরিক্ত বিক্রয় যোগ্য জিনিস থাকলে তা বিক্রয় করে ফিতরার সদাকাহ আদায় করতে হবে।
যে ব্যক্তির সদাকা আদায় করার মত কিছু আছে ; কিন্তু তার ওই পরিমাণ দেনা আছে ; তবুও তাকে তা আদায় করতে হবে। তবে যদি ঋণদাতা তার ঋণ পরিশোধ নেওয়ার জন্য তাগাদা করে থাকে, তাহলে সে ক্ষেত্রে আগে ঋণ পরিশোধ করাই আবশ্যিক ; আর তার জন্য যাকাত ফরজ নয়। পড়ন্ত যাকাত ওয়াজিব হওয়ার আগে যদি দেনা শোধ করার সময় উপস্থিত হয়ে থাকে, তাহলে ঋণদাতার পক্ষ থেকে তাগাদা না থাকলেও আগে দেনা শোধ করতে হবে এবং ফিতরার যাকাত মাফ হয়ে যাবে।
যার কাছে বর্তমানে কিছু নেই, কিন্তু পরে আসবে ; যেমন চাকুরীর বেতন, তাকে ঋণ করে সদাকা আদায় করতে হবে।
যদি কারো ঘরে আড়াই কেজি পরিমাণ চাইতে কম খাদ্য থাকে, তাহলে সে তাই আদায় করবে। কারণ মহান আল্লাহ বলেন,
فاتقوا الله ما استطعتم
" তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় কর " ( কুরআনুল কারীম ৬৪ :১৬) আর মহানবী (সা :)- বলেছেন, " আমি যখন তোমাদেরকে কিছু আদেশ করি, তখন তোমরা তা যথাসাধ্য ( যতটা পার) পালন কর।
যার ভরণ পোষণ করা ওয়াজিব, তার তরফ থেকেও ফিতরার যাকাত আদায় করা ওয়াজিব ; যেমন স্ত্রী সন্তান প্রভৃতি - যদি তারা নিজেদের যাকাত নিজেরা আদায় করতে সক্ষম না হয় তাহলে। অন্যথা তারা নিজেরা নিজেদের ফিতরাহ আদায় করলে সেটাই উত্তম। যেহেতু শরীয়তের আদেশে প্রত্যেক ব্যক্তিকে সরাসরি সম্বোধন করা হয়। তাছাড়া ইবনে উমার (রা:) এর হাদিসে বলা হয়েছে যে, আল্লাহর রাসূল (সা:)- ছোট - বড় এবং স্বাধীন- ক্রীতদাস ; যাদের ভরণ - পোষণ তোমাদেরকে করতে হয় তাদের সকলের পক্ষ থেকে ফিতরার সদাকাহ আদায় করতে আদেশ করেছেন।
মাতৃজঠরে ভ্রূণের বয়স যদি ১২০ দিন হয়ে থাকে, তাহলে তার পক্ষ থেকেও ফিতরার যাকাত আদায় করা মুস্তাহাব বলে কিছু উলামা মনে করেন। বলা বাহুল্য, ভ্রুণের তরফ থেকে ফিতরাহ আদায় ওয়াজিব নয়।
ফিতরার যাকাতের পরিমাণ কত?
ফিতরার সদাকাহ ওয়াজিব হলো এক সা' পরিমাণ। এখানে সা' বলতে মদিনায় প্রচলিত নববী সা' উদ্দিষ্ট। পৃথিবীর অন্য কোন অঞ্চলে সা' প্রচলিত থাকলেও তা যদি মাদানী সা' থেকে মাপে ভিন্ন হয়, তাহলে ফিতরা আদায়ের ক্ষেত্রে সে সা' - এর মাপ গ্রহণযোগ্য নয়।
নববী সা' - এর মাপ অনুযায়ী বর্তমান যুগে ভালো ধরনের গমের ওজন হয় ২ কেজি ৪০ গ্রাম। অবশ্য চাল ইত্যাদি সলিট খাদ্য-দ্রব্যের ওজন তার থেকে বেশি হবে । অতএব এক সা' পরিমান খাদ্যের মাঝামাঝি ওজন হবে মোটামুটি আড়াই কেজি মত।
পক্ষান্তরে অর্ধ সা' গম ফিতরা দেওয়ার ব্যাপারটা মুয়াবিয়া (রা:)- এর নিজস্ব মত ; যে মতের বিরোধিতা করেছেন আবু সাঈদ খুদরী (রা:)। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল (সা:)- যখন আমাদের মাঝে ছিলেন, তখন আমরা ফিতরার সদাকা প্রত্যেক ছোট ও বড়, স্বাধীন ও ক্রীতদাসের তরফ থেকে এক সা' খাদ্য ; এক সা' পনির, এক সা' যব, এক সা' খেজুর অথবা এক সা' কিসমিস আদায় দিতাম।এই ভাবেই আমরা সদাকাহ আদায় দিতাম ; অতঃপর একদা মুআবিয়া বিন আবূ সুফিয়ান হজ্জ অথবা উমরা উমরাহ করতে এসে ( মদীনায়) এলেন। সেই০ সময় তিনি মিম্বরে খুতবাহ দেওয়ার সময় লোকেদের উদ্দেশ্যে যে সব কথা বলেছিলেন, তার মধ্যে একটি কথা ছিল এই যে, আমি মনে করি শামের অর্থ সা' (উৎকৃষ্ট) গম এক সা' খেজুরের সমতুল্য। ' ফলে লোকেরা তাঁর এ মত গ্রহণ করে নিল।আবূ সাঈদ বলেন, ' কিন্তু আমি ততটা পরিমাণ খাদ্যই আজীবন আদায় দিতে থাকব, যতটা পরিমাণ আমি পূর্বে ( আল্লাহর রসূল (সা:)- এর যুগে) আদায় দিতাম।
ত্বহাবী প্রমুখ হাদিস গ্রন্থের এক বর্ণনায় আছে, আবূ সাঈদ বলেন, ' আমি ততটা পরিমাণ খাদ্যই আদায় দিতে থাকব, যতটা পরিমাণ আমি আল্লাহর রসূল ( সা:)- এর যুগে আদায় দিতাম ; এক সা' খেজুর, এক সা' যব, এক সা' কিসমিস অথবা এক সা' পনীর।' এক ব্যক্তি তাঁকে বলল, ' অথবা অর্ধ সা' গম? তিনি বললেন, ' না।এটা হল মুআবিয়ার মূল্য নির্ধারণ ; আমি তা গ্রহণ করি না এবং তার এ মতের উপর আমলও করি না।
এক সা' গম ফিতরাহ দেওয়ার কথা মহানবী (সা:)- থেকে প্রমাণিত নয়। যেমন অর্ধ সা' গম ফিতরাহ দেওয়ার হাদিস সহীহর দরজায় পৌঁছে না।
বলা বাহুল্য, ফিতরার মূল্য নির্ধারণ সঠিক হবে না। বরং মূল্য প্রত্যেক যুগে এবং প্রত্যেক দেশে ভিন্ন ভিন্ন হবে। কোন সময় এমনও হতে পারে যে, ( খেজুরের পরিমাণে) ফিতরায় কয়েক সা' গম আদায় দিতে হবে।
মোটকথা, সা' - এর পরিমাপকেই ফিতরার মাপকাঠি গণ্য করা হল মৌলিক ব্যাপার এবং তাতেই রয়েছে সর্বপ্রকার খাদ্য এবং সর্বযুগের জন্য পূর্ব সতর্কতামূলক আমল। আর এই মত অনুসরণ করার মাধ্যমে এ ব্যাপারে মতভেদকে এড়ানো সম্ভব হবে এবং মান্য করা হবে সুনিশ্চিত ভাবে প্রমাণিত হাদিসকে।
সদাকাতুল ফিতর কোন খাদ্য থেকে আদায় করতে হবে?
সদাকাতুল ফিতর দেশের প্রধান খাদ্য থেকেই হওয়াই বাঞ্চনীয় ; যদিও হাদিসে সে খাদ্যের উল্লেখ নেই, যেমন চাল। পক্ষান্তরে যেসব খাদ্যের কথা হাদিসে স্পষ্ট উল্লেখ এসেছে ; যেমন খেজুর, যব, কিসমিস ও পনীর - এ সব খাদ্য আল্লাহর রাসূল (সা:)- এর যুগের মতো দেশের প্রধান খাদ্য না হলে তা থেকে ফিতরা আদায় যথেষ্ট হবে না। হাদিসে ওই চারটি খাদ্যের উল্লেখ আসার কারণ হল,সে যুগে মদীনায় সেগুলি প্রধান খাদ্যসামগ্রীরূপে ব্যবহার হত।সুতরাং তার উল্লেখ উদাহরণস্বরূপ করা হয়েছে,নির্ধারণস্বরূপ নয়। আবু সাঈদ (রা:)- বলেন, ' আমরা আল্লাহর রাসূল (সা:)- এর জামানায় ঈদের দিন এক সা' খাদ্য আদায় দিতাম। আর তখন আমাদের খাদ্য ছিল যব, কিসমিস, পনির ও খেজুর।
এখানে ' খাদ্য ' বলে মৌলিক উপাদানের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। অর্থাৎ ফিতরা ছিল মানুষের খাদ্য ও আহার ; যা খেয়ে লোকেরা জীবন ধারণ করত। এ কথার সমর্থন করে ইবনে আব্বাস (রা:)- এর হাদিস ; তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (সা:)- রোজাদারের অসারতা ও যৌনচারের পঙ্কিলতা থেকে পবিত্রতা এবং মিসকীনদের আহার স্বরূপ ( সদাকাতুল ফিতর) ফরজ করেছেন।
সুতরাং যে দেশের প্রধান খাদ্য কোন শস্য অথবা ফল না হয় ; বরং গোশত হয়, যেমন যারা পৃথিবীর উত্তর মেরুতে বসবাস করে তাদের প্রধান খাদ্য হলো গোশত, তারা যদি ফিতরায় গোশত দান করে, তাহলে সঠিক মত এই যে, নিঃসন্দেহে তা যথেষ্ট হবে।
সারকথা, দেশের প্রধান খাদ্য শস্য, ফল বা গোশত যাই হোক না কেন, ফিতরায় তা দান করলে ফিতরা আদায় হয়ে যাবে। তাতে সে খাদ্যের কথা হাদিসে স্পষ্ট উল্লেখ থাক অথবা না থাক।
উক্ত আলোচনার প্রেক্ষাপটে বলা যায় যে, ফিতরায় টাকা - পয়সা, কাঁথা- বালিশ- চাটাই, লেবাশ- পোশাক,পশুখাদ্য অথবা কোন আসবাব - পত্র দান করলে তা যথেষ্ট নয়। কারণ, তা আল্লাহর রাসূল (সা:)- এর নির্দেশ বিরোধী। আর তিনি বলেছেন, " যে ব্যক্তি এমন কোন কাজ করে, যাতে আমাদের নির্দেশ নেই, তাপ প্রত্যাখ্যাত। যে ব্যক্তি আমাদের এ ব্যাপারে নতুন কিছু উদ্ভাবন করে যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।
টাকা - পয়সা হিসাবে ( রুপার) দিরহাম এবং ( সোনার) দীনার মুদ্রা আল্লাহর রাসূল (সা:)- এর জামানায় মজুদ ছিল। কিন্তু তা সত্বেও তিনি ফিতরার যাকাতে এক সা' খাদ্য দান করতেই আদেশ করলেন এবং তার মূল্য দান করার এখতিয়ার ঘোষণা করলেন না। সুতরাং ফিতরায় খাদ্যের দাম আদায় দেওয়া সাহাবা (রা:)- গনের বিরুদ্ধাচরণ। যেহেতু তাঁরা ফিতরার সদাকায় এক সা' খাদ্যই দান করতেন। পড়ন্তু আল্লাহর রাসূল (সা:)- বলেছেন, " তোমরা আমার সুন্নাহ ( তরীকা) ও আমার পরবর্তী সুপথপ্রাপ্ত খলীফাদের সুন্নাহ অবলম্বন কর।তা খুব সুদৃঢ়ভাবে ধারণ কর। আর অভিনব কর্মাবলী থেকে সাবধান থেকো।
তাছাড়া ফিতরার যাকাত নির্দিষ্ট দ্রব্য থেকে আদায়যোগ্য একটি ফরজ ইবাদত। অতএব নির্দিষ্ট দ্রব্য ছাড়া অন্য দ্রব্য আদায়ের মাধ্যমে ওই ফরজ পালন হবে না ; যেমন তার নির্দিষ্ট সময় ছাড়া অন্য সময় তার যথেষ্ট হবে না। পক্ষান্তরে ফিতরায় খাদ্য দান করা ইসলামের একটি স্পষ্ট প্রতীক। কিন্তু মূল্য আদায় দিলে তা গোপন দানে পরিণত হয়ে যায়। বলা বাহুল্য, সুন্নাহর অনুসরণ করাই আমাদের জন্য উত্তম এবং তাতেই আছে সার্বিক মঙ্গল।
এ থেকে আমরা বুঝতে পারলাম যে, গ্রাম - শহর সকল স্থানে প্রধান খাদ্য চাল ফিতরা দেওয়ার পরিবর্তে তার নির্দিষ্ট মূল্য আদায় করা যথেষ্ট নয়। চাকুরিজীবী হলেও তাকে চাল ক্রয় করেই ফিতরা দিতে হবে। অবশ্য তার কোন এমন প্রতিনিধি অথবা কোন এমন সংস্থাকে টাকা দেওয়া চলবে, যে খাদ্য ক্রয় করে ঈদের আগে গরিবদের হাতে পৌঁছে দেবে।
আর দানের ক্ষেত্রে মধ্যম ধরনের চাল এখতিয়ার করা বাঞ্ছনীয়। নচেৎ ইচ্ছাকৃত নিম্নমানের চাল দান করলে মহান আল্লাহর দরবারে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। মহান আল্লাহ বলেন,
( হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের উপার্জিত এবং ভূমি হতে উৎপাদনকৃত বস্তুর মধ্যে যা উৎকৃষ্টতা দান কর।) আর তা হতে মন্দ জিনিস দান করো না ; অথচ চোখ বন্ধ করে ছাড়া তোমরা নিজে তা গ্রহণ করবে না। ( কুরআনুল কারীম ২: ২৬৭)
ফিতরা কখন ওয়াজিব হয়?
রমজানের শেষ দিনের সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে ফিতরার যাকাত ওয়াজিব হয়। এ সময় হল রমজানের শেষ রোজা ইফতার করার সময়। আর এ সময়ের দিকে সম্বন্ধ করে তার নাম হয়েছে 'সদাকাতুল ফিতর'। বলা বাহুল্য, ইফতার করার সময় বাস্তবায়িত হয় ঈদের রাতের সন্ধ্যায় সূর্য ডোবার সাথে সাথে। অতএব এ সময়ে যে শরীয়তের আজ্ঞাপ্রাপ্ত থাকবে কেবল তারই উপর ঐ যাকাত ওয়াজিব এবং তার পরে কেউ আজ্ঞাপ্রাপ্ত হলে তা ওয়াজিব নয়।
যেমন ঈদের রাতের সূর্য ডোবার সামান্যক্ষণ পর যদি কেউ ইসলামে দীক্ষিত হয় অথবা কোন শিশু জন্মগ্রহণ করে, অথবা শেষ রমজানের সূর্য ডোবার সামান্যক্ষণ পূর্বে যদি কেউ মারা যায়,তাহলে উক্ত প্রকার লোকেদের ওপর ফিতরা ওয়াজিব নয়। অবশ্য মায়ের গর্ভে ভ্রুনের তরফ থেকে যাকাত দেওয়া অনেক উলামা মুস্তাহাব বলেছেন ; যেমন সে কথা পূর্বে উল্লেখ হয়েছে।
পক্ষান্তরে ঐ দিনের সূর্য ডোবার সামান্য ক্ষণ আগে যদি কেউ ইসলামে দীক্ষিত হয় অথবা কোন শিশু জন্মগ্রহণ করে, অথবা সূর্য ডোবার সামান্য ক্ষণ পরে যদি কেউ মারা যায়, তাহলে উক্ত প্রকার লোকেদের ওপর ফিতরা ওয়াজিব।
ফিতরা কখন দিতে হবে?
ফিতরা আদায় করার দুটি সময় আছে ; তার মধ্যে একটি সময়ে আদায় দিলে ফজিলত পাওয়া যাবে এবং অন্য একটি সময় দান করলে যথেষ্ট হয়ে যাবে। প্রথম সময় দিতে হয় এবং দ্বিতীয় সময় দেওয়া চলে। প্রথম সময় দেওয়ায় বিধেয় এবং দ্বিতীয় সময় দেওয়া বৈধ।
এই যাকাত আদায়ের ফজিলতের সময় হল, ঈদের সকালে নামাজের পূর্বে।আবূ সাঈদ খুদরী (রা:)- বলেন, ' আমার নবী (সা:)- এর যুগে ঈদুল ফিতরের দিন এক সা' খাদ্য দান করতাম।
ইবনে উমার (রা:)- বলেন, নবী(সা:)- লোকেদের ঈদের নামাজের জন্য বের হওয়ার পূর্বে ফিতরার যাকাত আদায় দেওয়ার জন্য আদেশ দিয়েছেন।
যেহেতু মহান আল্লাহ বলেন,
সেই ব্যক্তি সাফল্য লাভ করবে, যে যাকাত দিয়ে পবিত্র হবে এবং তার প্রভুর নাম স্মরণ করে নামাজ পড়বে। (কুরআনুল কারীম ৮৭:১৪-১৫)
এই জন্যই ঈদুল ফিতরের নামাজ দেরি করে পড়া উত্তম। যাতে ফিতরা আদায় দেওয়ার জন্য সময় সংকীর্ণ না হয়।
এই যাকাত আদায়ের বৈধ সময় হলো ঈদের আগে দু- এক দিন। নাফে' বলেন, ' ইবনে উমার (রা:)- ছোট - বড় সকলের তরফ থেকে ফিতরা দিতেন ;এমন কি আমার ছেলেদের তরফ থেকেও তিনি ফিতরা বের করতেন । আর তাদেরকে দান করতেন, যারা তা গ্রহণ করত। তাদেরকে ঈদের এক অথবা দুই দিন আগে দিয়ে দেওয়া হত।
এ যাকাত দিতে ঈদের নামাজের পর পর্যন্ত দেরি করা বৈধ নয়। সুতরাং যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের পর তা আদায় দেয়, তার যাকাত কবুল হয় না। কারণ, তার কাজ মহানবী (সা:)- এর নির্দেশ বিরোধী। ইবনে আব্বাসের হাদিসে বর্ণিত মহানবী (সা:)- বলেন," যে ব্যক্তি তার নামাজের পূর্বে আদায় দেয় তার যাকাত কবুল হয়। আর যে তা নামাজের পরে আদায় দেয়, তার সে যাকাত সাধারণ দান বলে গণ্য হয়। "
অবশ্য কোন অসুবিধার জন্য নামাজের পর দিলে তার যাকাত কবুল হয়ে যাবে। যেমন, যদি কেউ ঈদের সকালে এমন জায়গায় থাকে, যেখানে যাকাত দেওয়ার মত লোক নেই, অথবা সকালে হঠাৎ করে ঈদের খবর এলে ফিতরা আদায় দেওয়ার সুযোগ না পেলে, অথবা অপর কাউকে তা আদায় দেওয়ার ভার দেওয়ার পর সেটা ভুলে গেলে ঈদের নামাজের পর তা আদায় দিলে দোষাবহ নয়।যেহেতু এই ব্যাপারে তার ওজর গ্রহণযোগ্য।
ওয়াজিব হল, যথা সময়ে ঈদের নামাজের পূর্বেই গরিব -মিসকিনদের হাতে অথবা তাদের কোন প্রতিনিধির হাতে পৌঁছে যাওয়া । যাকে দেওয়ার ইচ্ছা ছিল তাকে বা তার প্রতিনিধিকে সে সময় না পাওয়া গেলে অন্য হকদারকে দান করে দিতে হবে। তবুও যথা সময় অতিবাহিত করা যাবে না।
পক্ষান্তরে ইবনে উমার কর্তৃক যে হাদীস বর্ণিত আছে, ঈদের নামাজের জন্য বের হয়ে যাওয়ার পূর্বে আমাদেরকে ফিতরার যাকাত বের করে দেওয়ার আদেশ দেওয়া হত। অতঃপর নামাজ থেকে ফিরার পর আল্লাহর রাসূল (সা:)- তা মিসকীনদের মাঝে বন্টন করে দিতেন ---তা সহিহ নয় ;বরং তা অপ্রামান্য ও যয়ীফ।
সদাকাতুল ফিতর কোথায় দিতে হবে?
যাকাত আদায় করার সময় মুসলিম যে জায়গায় থাকে, সে জায়গায় দরিদ্র মানুষদের মাঝে বিতরণ করতে হবে।তাতে সে জায়গা তার স্থায়ী আবাসভূমি হোক অথবা অস্থায়ী প্রবাসভূমি। বিশেষ করে সে জায়গা যদি মাহাত্ম্যপূর্ণ হয়; মক্কা ও মদীনা, অথবা সে জায়গার গরিব মানুষরা বেশি অভাবী হয়, তাহলে সে জায়গাতেই যাকাত বন্টন করা কর্তব্য।
কিন্তু অবস্থান ক্ষেত্রে যদি সদাকাহ গ্রহণকারী কোন গরিব মানুষ না থাকে, অথবা হকদার লোক জানা না থাকে, তাহলে যেখানে আছে সেখানে কোন প্রতিনিধিকে যাকাত বিতরণ করার ভার অর্পণ করতে হবে। তবে অবশ্যই তাদের হাতে সেই যাকাত ঈদের নামাজের আগে পৌঁছতে হবে।
ফিতরার যাকাতের হকদার ও বন্টন পদ্ধতি :
ফিতরার যাকাতের হকদার হলো গরীব মানুষরা এবং সেই ঋণগ্রস্থ মানুষরা, যারা তাদের ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না। মানুষদেরকে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী যাকাত দেওয়া যাবে।
একটি ফিতরা কয়েকটি মিসকীনকে দেওয়া চলবে। যেমন কয়েকটি ফিতরা দেওয়া চলবে একটি মাত্র মিসকীনকে। যেহেতু মহানবী (সা:)- কত দিতে হবে তা নির্ধারণ করেছেন ;কিন্তু কয়জন মিসকিনকে দিতে হবে, তা নির্ধারণ করেন নি।
সুতরাং যদি কয়েক জন মিলে নিজ নিজ ফিতরা মেপে এক জায়গায় জমা করে এবং তারপর না মেপেই মিসকীনদের মাঝে বিতরণ করে তাহলে তাতে কোন ক্ষতি নেই। তবে এ কথা মিসকীনদেরকে জানিয়ে দেওয়া উচিত যে, তারা ঐ দানের পরিমাণ জানে না। নচেৎ, মাপা আছে মনে করে কেউ ঐ ফিতরা নিজের তরফ থেকে আদায় দিলে ধোকায় পড়তে পারে।
বলা বাহুল্য, মিসকীন কারো কাছ থেকে ফিতরা নিয়ে সেই ফিতরাই নিজের অথবা পরিবারের কারো তরফ থেকে অন্য মিসকীনকে ফিতরা হিসেবে দিতে পারে। অবশ্য সে তা মেপে নেবে অথবা যে দিয়েছে তার কাছ থেকে বিশ্বাস্যরূপে জেনে নেবে যে, তা পরিপূর্ণ একটি ফিতরা।
উপসংহার:
ফিতরা বা সদাকাতুল ফিতর শুধু একটি আর্থিক দান নয়; এটি রমজানের ইবাদতের পর আত্মশুদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এর মাধ্যমে রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতি পূরণ হয় এবং ঈদের আনন্দ সমাজের দরিদ্র মানুষের ঘরে পৌঁছে যায়। তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে, সঠিক নিয়মে এবং উত্তম জিনিস দিয়ে ফিতরা আদায় করা প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে যথাযথভাবে ফিতরা আদায় করার তাওফিক দান করুন এবং আমাদের আমলগুলো কবুল করুন। আমিন। আপনাদের সকলকে লেখাটি গুরুত্ব সহকারে পড়ার অনুরোধ রইল।
ড্রিমিক্স আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url