রোজা অবস্থায় যা বৈধ
রোজা অবস্থায় যা বৈধ
ভূমিকা:
কিছু কাজ আছে, যা রোজা অবস্থায় করা বৈধ নয় বলে অনেকের মনে হতে পারে, অথচ তা রোজাদারের জন্য করা বৈধ। সেই ধরনের কিছু কাজের কথা আজ আমি এই পোস্টে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।
আশা করি আপনারা এই পোস্টটি পড়ে আপনাদের বিভিন্ন ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন। তাই আপনাদের নিজেদের প্রয়োজনে সকলকে এই পোস্টটি পড়ার অনুরোধ রইল।
সূচিপত্র :
- পানিতে নামা, ডুব দেওয়া ও সাঁতার কাটা
- মিসওয়াক বা দাঁতন করা
- সুরমা লাগানো এবং চোখে ও কানে ওষুধ ব্যবহার
- মলদ্বারে ওষুধ ব্যবহার
- পেটে (অ্যান্ড্রসকপি মেশিন) নল সঞ্চালন
- বাহ্যিক শরীরে তেল, মলম, পাউডার বা ক্রিম ব্যবহার
- দেহের দূষিত রক্ত বহিষ্করণ
- নাক অথবা কোন কাটা ফাটা থেকে রক্ত বের হওয়া
- রক্তদান করা
- দাঁত তোলা
- কিডনি পরিস্কার
- আহারের কাজ দেয় না এমন (ওষুধ) ইনজেকশন ব্যবহার করা
- ক্ষতস্থানে ওষুধ ব্যবহার
- মাথা ইত্যাদি চুল কাটা
- কুলি করা ও নাকে পানি দেওয়া
- সুগন্ধির সুঘ্রাণ নেওয়া
- নাকি বা মুখে স্প্রে ব্যবহার
- রাস্তার ধুলা
- থুথু ও গয়ের
- স্বামী-স্ত্রীর সাধারণ মেলামেশা যে রোজাদার স্বামী স্ত্রী মিলনে ধৈর্য রাখতে পারে
১.পানিতে নামা, ডুব দেওয়া ও সাঁতার কাটা :
রোজাদারের জন্য পানিতে নামা, ডুব দেওয়া ও সাঁতার কাটা, একাধিকবার গোসল করা, এসির হাওয়াতে বসা এবং কাপড় ভিজিয়ে গায়ে মাথায় জড়ানো বৈধ। যেমন পিপাসা ও গরমের তাড়নায় মাথায় পানি ঢালা, বরফ বা আইসক্রিম চাপানো দোষের নয়।
মা আয়েশা (রাঃ)বলেন, রোজা রেখে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর অপবিত্র অবস্থায় ফজর হতো। অতঃপর তিনি গোসল করতেন।
আবু বকর বিন আব্দুর রহমান নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কিছু সাহাবী থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি (সাহাবী) বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (সাঃ)-কে দেখেছি, তিনি রোজা রেখে পিপাসা অথবা গরমের কারণে নিজ মাথায় পানি ঢেলেছেন।
রোজা রাখা অবস্থায় ইবনে ওমর একটি কাপড় ভিজিয়ে নিজের দেহের ওপর রেখেছেন।
অবশ্য সাঁতার কেটে খেলা করা মাকরুহ।কারণ, তাতে রোজা নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে তাই। কিন্তু যার কাজই হল ডুবরীর অথবা প্রয়োজনের তাগিদে পানিতে বারবার ডুব দিতে হয়, সে ব্যক্তি পেটে পানি পৌঁছানো থেকে সাবধান থাকতে পারলে তার রোজার কোন ক্ষতি হবে না।
২.মিসওয়াক বা দাঁতন করা :
দাঁতন করা রোযাদার -অরোযাদার সকলের জন্য এবং দিনের শুরু ও শেষ ভাগে সব সময় কার জন্য সুন্নত। এ ব্যাপারে মহানবী (সাঃ)-এর নির্দেশ ব্যাপক ;তিনি বলেন, "দাঁতন করায় রয়েছে মুখের পবিত্রতা এবং প্রতিপালক আল্লাহর সন্তুষ্টি। "
প্রিয় নবী (সাঃ)-বলেন, "আমি উম্মতের জন্য কষ্টকর না জানলে তাদেরকে প্রত্যেক নামাজের সময় দাঁতন করতে আদেশ দিতাম। "অন্য এক বর্ণনায় আছে, "-----তাদেরকে প্রত্যেক ওযুর সময় দাঁতন করতে আদেশ দিতাম। "
ইমাম ত্বাবারানী উত্তম সনদ দ্বারা বর্ণনা করেছেন যে, আব্দুর রহমান বিন গুনম বলেন, আমি মুয়ায বিন জাবাল (রাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, 'আমি কি রোজা অবস্থায় দাঁতন করব?' উত্তরে তিনি বললেন, 'হ্যাঁ। 'আমি বললাম, 'দিনের কোন ভাগে? 'তিনি বললেন 'সকাল অথবা বিকালে। 'আমি বললাম, 'লোকে তো রোযার বিকালে দাঁতন করাকে অপছন্দনীয় মনে করে। তারা বলে, আল্লাহর রাসূল (সাঃ)-বলেছেন, "নিশ্চয়ই রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর নিকট কস্তুরীর সুবাস অপেক্ষা অধিকতর সুগন্ধময়। "মুয়ায (রাঃ) বললেন, 'সুবহানাল্লাহ! তিনি তাদেরকে দাঁতন করতে আদেশ দিয়েছেন। আর যে জিনিস তিনি পরিষ্কার করতে আদেশ দিয়েছেন, সে জিনিসকে ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্গন্ধময় করা উত্তম হতে পারে না। তাতে কোন প্রকারের মঙ্গল নেই ;বরং তাতে অমঙ্গলই আছে।
কিন্তু যদি কোন দাঁতনে বিশেষ স্বাদ থাকে এবং তা তার থুথুকে প্রভাবান্বিত করে,তাহলে তার স্বাদ বা থুথু গিলে নেওয়া উচিত নয়।
পরন্ত সেই দাঁতন করা থেকে দূরে থাকা উচিত, যার দ্রবণশীল উপাদান (ও রস) আছে। যেমন কাঁচা (গাছের ডালের বার শিকরের) দাঁতন। তদনুরূপ সেই দাতঁন,যাতে তার নিজস্ব স্বাদ ছাড়া ভিন্ন স্বাদ ;যেমন লেবু বা পুদিনা (পিপারমেন্ট, মেন্থল) ইত্যাদির স্বাদ অতিরিক্ত করা হয়েছে এবং যা মুখের ভেতরে গিয়ে দ্রবীভূত হয়ে মুখগহ্বরে ছড়িয়ে পড়ে। আর ইচ্ছা করে তা গিলে ফেলা বৈধ নয়। তবে যদি অনিচ্ছাকৃত কেউ গিলে ফেলে, তাহলে তাতে কোন ক্ষতি হয় না।
পক্ষান্তরে রোজার দিনে দাঁতের মাজন (টুথপেস্ট বা পাউডার) ব্যবহার না করাই উত্তম। বরং তা রাত্রে এবং ফজরের আগে ব্যবহার করা উচিত। কারণ, মাজনের এমন প্রতিক্রিয়া ও সঞ্চার ক্ষমতা আছে, যার ফলে তা গলা ও পাকস্থলীতে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনুরূপ আশঙ্কার ফলেই মহানবী (সাঃ) লাকিত্ব বিন সাবরাহকে বলেছিলেন, " (ওযু করার সময়) তুমি নাকে খুব অতিরঞ্জিত ভাবে পানি টেনে নিও। কিন্তু তুমি রোজা থাকলে নয়।
বলাবাহুল্য, রোজাদারের জন্য মাজন ব্যবহার না করাই উত্তম। আর এ ব্যাপারে সংকীর্ণতা নেই। কারণ, সে ইফতার করে নেওয়া পর্যন্ত সময় অপেক্ষা করে যদি তা ব্যবহার করে, তাহলে সে এমন এক জিনিস থেকে দূরে থাকতে পারবে, যার দ্বারা তার রোজা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পক্ষান্তরে নেশাদার ও দেহে অবসন্ন আনয়নকারী মাজন ; যেমন, গুল-গুরাকু প্রভৃতি ;যা ব্যবহারের ফলে মাথা ঘোরে অথবা ব্যবহারকারী গান শূন্য হয়ে যায়, তা ব্যবহার করা বৈধ নয় ;না রোজা অবস্থায় এবং না অন্য সময়। কারণ, তা মহানবী (সাঃ)-এর এই বাণীর আয়তাভুক্ত হতে পারে, যাতে তিনি বলেন, "প্রত্যেক মাদকতা আনায়নকারী দ্রব্য হারাম। "
জ্ঞাতব্য যে, দাঁতের মাড়িতে ক্ষত থাকার ফলে অথবা দাঁতন করতে গিয়ে রক্ত বের হলে তাগিলে ফেলা বৈধ নয় ;বরং তা বের করে ফেলা জরুরী। অবশ্য যদি তা নিজের ইচ্ছা ও এখতিয়ার ছাড়াই গলায় নেমে যায়, তাহলে তাতে কোন ক্ষতি হবে না।
৩. সুরমা লাগানো এবং চোখে ও কানে ওষুধ ব্যবহার :
রোজা অবস্থায় সুরমা লাগানো এবং চোখে ও কানে ওষুধ ব্যবহার বৈধ। কিন্তু ব্যবহার করার পর যদি গলায় সুরমা বা ওষুধের স্বাদ অনুভূত হয়, তাহলে (কিছু ওলামার নিকট রোজা ভেঙে যাবে এবং সে রোজা) কাদা রেখে দেওয়াই হল পূর্ব সতর্কতামূলক কর্ম। কারণ, চোখ ও কান খাদ্য ও পানীয় পেটে যাওয়ার পথ নয় এবং সুরমা বা ওষুধ লাগানো কে খাওয়া বা পান করাও বলা যায় না ;না সাধারণ প্রচলিত কথা এবং না-ই শরয়ী পরিভাষায়। অবশ্য রোজাদার যদি চোখে বা কানে ওষুধ দিনে ব্যবহার না করে রাতে করে, তাহলে সেটাই হবে পূর্ব সাবধানতা মূলক কর্ম।
হযরত আনাস (রাঃ)রোজা থাকা অবস্থায় সুরমা ব্যবহার করতেন।
পক্ষান্তরে রোজা থাকা অবস্থায় নাকে ওষুধ ব্যবহার করা বৈধ্য নয়। কারণ, নাকের মাধ্যমে পানাহার পেটে পৌঁছে থাকে। আর এজন্যই মহানবী (সাঃ) বলেছেন, "(ওযূ করার সময়) তুমি নাকে খুব অতিরঞ্জিত ভাবে পানি টেনে নিও। কিন্তু তোমার রোজা থাকলে নয়।
বলা বাহুল্য উক্ত হাদিস এবং অনুরূপ অর্থের অন্যান্য হাদিসের ভিত্তিতে নাকে ওষুধ ব্যবহার করার পর যদি গলাতে তার স্বাদ অনুভূত হয়, তাহলে রোজা নষ্ট হয়ে যাবে এবং সেই রোজা কাজা করতে হবে।
৪.মলদ্বারে ওষুধ ব্যবহার :
রোজাদারের জ্বর হলে তার জন্য মলদ্বারে ওষুধ (সাপোজিটর) রাখা যায়। তদনুরূপ জ্বর মাপা বা অন্য কোন পরীক্ষার জন্য মলদ্বারে কোন যন্ত্র ব্যবহার করা দোষাবহ বা রোজার পক্ষে ক্ষতিকর নয়। কারণ, এ কাজকে খাওয়া বা পান করা কিছুই বলা হয় না। (এবং মলদ্বার পানাহারের পথ ও নয়)
৫.পেটে (অ্যান্ড্রসকপি মেশিন) নল সঞ্চালন :
পেটের ভিতর কোন পরীক্ষার জন্য ( এন্ড্রোস কপি মেশিন) নল বা স্টমাক টিউব সঞ্চালন করার ফলে রোজার কোন ক্ষতি হয় না। তবে হ্যাঁ, যদি পাইপের সাথে কোন তৈলাক্ত পদার্থ থাকে এবং তা তার সাথে পেটে গিয়ে পৌঁছে, তাহলে তাতে রোজা নষ্ট হয়ে যাবে। অতএব একান্ত প্রয়োজন ছাড়া এ কাজ ফরজ বা ওয়াজিব রোজায় করা বৈধ নয়।
৬.বাহ্যিক শরীরে তেল, মলম, পাউডার বা ক্রিম ব্যবহার :
বাহ্যিক শরীরের চামড়ায় পাউডার বা মলম ব্যবহার করা রোজাদারের জন্য বৈধ। কারণ, তা পেটে পৌঁছে না।
তদনুরূপ প্রয়োজনের ত্বককে নরম রাখার জন্য কোন তেল, ভ্যাসলিন বা ক্রিম ব্যবহার করাও রোজা অবস্থায় অবৈধ নয়। কারণ, এসব কিছু কেবল চামড়ার বাহিরের অংশ নরম করে থাকে এবং শরীরের ভিতরে প্রবেশ করে না। পড়ন্ত যদিও লোমকূপে তা প্রবেশ হওয়ার কথা ধরেই নেওয়া যায়, তবুও তাতে রোজা নষ্ট হবে না।
রোজা অবস্থায় মহিলাদের জন্য হাতে মেহেদি, পায়ে আলতা অথবা চুলে (কালো ছাড়া অন্য রঙের) কলব ব্যবহার বৈধ। এই সবে রোজা বা রোজাদারের উপর কোন (মন্দ) প্রভাব ফেলে না।
৭.দেহের দূষিত রক্ত বহিষ্করণ :
রোজা অবস্থায় কোন যন্ত্র দ্বারা অথবা যন্ত্র ছাড়াই, পা থেকে অথবা মাথায় কোন শিরা থেকে, মুখে করে চুষে অথবা যে কোন প্রকারে দেহ থেকে দূষিত রক্ত বের করলে রোজা নষ্ট হবে কিনা, সে নিয়ে ওলামাদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। যেহেতু মহানবী (সাঃ) কতৃক উভয় শ্রেণীর বর্ণনা মজুদ রয়েছে। তিনি বলেন, "দেহ থেকে দূষিত রক্ত যে বের করে তার এবং যার বের করা হয় তারও রোজা নষ্ট হয়ে যায়। " এ কথা বর্ণিত আছে যে, তিনি রোজা অবস্থায় নিজ দেহ থেকে দূষিত রক্ত বের করেছেন। আর তিনি বলেছেন, যে অনিচ্ছাকৃত বমি করে, যার স্বপ্নদোষ হয় এবং যে দেহ থেকে দূষিত রক্ত বের করে তার রোজা নষ্ট হয় না। "
দেহ থেকে দূষিত রক্ত বের করলে রোজা নষ্ট হয়ে যাওয়ার হাদিস যে মনসূখ (রহিত) সে ব্যাপারে সাক্ষ্য বহন করে হযরত আনাস (রাঃ) -এর হাদিস। তিনি বলেন, 'শুরু শুরু রোজাদারের জন্য দেহ থেকে দূষিত রক্ত বের করা মাকরূহ ছিল। একদা জাফর বিন আবু তালেব রোজা অবস্থায় দেহ থেকে দূষিত রক্ত বের করলেন। তা দেখে তিনি বললেন, "এদের ওভার রোজা নষ্ট। "অতঃপর পরবর্তীকালে তিনি রোজাদারের জন্য দেহ থেকে দূষিত রক্ত বের করা অনুমতি দিলেন। 'আর স্বয়ং হযরত আনাস রোজা অবস্থায় দেহ থেকে দূষিত রক্ত বের করতেন।
একদা তাকে প্রশ্ন করা হলো, 'আপনারা আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর যুগে কি রোজা অবস্থায় দেহ থেকে দূষিত রক্ত বের করাকে মকরূহ মনে করতেন? উত্তরে তিনি বললেন, 'না।অবশ্য দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা করলে মকরূহ মনে করা হত।
তদনুরূপ আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, 'আল্লাহর রাসূল (সাঃ)-রোজাদারকে স্ত্রী চুম্বন ও দেহ থেকে দূষিত রক্ত বের করার ব্যপার অনুমতি দিয়েছেন।
ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, পেটের ভিতরে কিছু প্রবেশ করলে রোজা ভাঙ্গে, কিছু বাহির হলে নয়।
উপরোক্ত কিছু বর্ণনায় অনুমতি দেওয়ার অর্থই হল যে, প্রথমে সে কাজ অবৈধ ছিল এবং পরে তা বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। অতএব সঠিক মত এই যে, দেহ থেকে দূষিত রক্ত বের করলে কারো রোজা নষ্ট হবে না, যে বের করে তার এবং যে বের করে দেবে তারও নয়।
বলা বাহুল্য, যদিও সঠিক মত এই যে, রোজা অবস্থায় দেহ থেকে দূষিত রক্ত বের করলে রোজা নষ্ট হবে না, তবুও উত্তম ও পূর্ব সর্তকতা মূলক আমল এই যে রোজাদার তা বর্জন করবে। এর ফলে সে মতভেদের বেড়াজাল থেকে নিষ্কৃতি পাবে, রক্ত বের করার পর সে দৈহিক দুর্বলতার শিকার হবে না এবং যে ব্যক্তি মুখে টেনে রক্ত বের করে সে ব্যক্তির গলায় কিছু রক্ত চলে গিয়ে তার রোজা নষ্ট না হয়ে যায়। অবশ্য একান্ত তা করার দরকার হলে দিনে না করে রাত্রে করবে। আর সেটাই হবে উভয়ের জন্য উত্তম।
৮..নাক অথবা কোন কাটা ফাটা থেকে রক্ত বের হওয়া :
দেহের কোন কাটা ফাটা অঙ্গ থেকে রক্ত পড়লে রোজা নষ্ট হয় না। বরং তা দেহ থেকে দূষিত রক্ত বের করার মতই। অনুরূপ নাক থেকে রক্ত পড়লেও রোজা নষ্ট নয়। কারণ, তাতে মানুষের কোন এখতিয়ার থাকে না। আর ইচ্ছে করে বের করলে তাও দেহ থেকে দূষিত রক্ত বের করার মত। তদনুরূপ মাথায় বা দেহের অন্য কোন জায়গায় পাথর বা অন্য কিছুর আঘাত লেগে রক্ত ঝরলে রোজা নষ্ট হয় না।
৯.রক্তদান করা :
পরীক্ষার জন্য কিছু রক্ত দেওয়া রোজাদারের জন্য বৈধ। এতে তার রোজার কোন ক্ষতি হয় না।
তদনুরূপ কোন রোগের প্রাণ বাঁচানোর উদ্দেশ্যে রক্ত দান করাও বৈধ এবং তার দেহ থেকে দূষিত রক্ত বের করার মতই। এতেও রোজার কোন ক্ষতি হয় না।
১০.দাঁত তোলা :
রোজাদারের জন্য দাঁত (স্টোন ইত্যাদি থেকে) পরিষ্কার করা, ডাক্তারী ভরণ (ইনলেই) ব্যবহার করা এবং যন্ত্রণায় দাঁত তুলে ফেলা বৈধ। তবে এসব ক্ষেত্রে তাকে একান্ত সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত, যাতে কোন প্রকার ঔষধ বা রক্ত গিলা না যায়।
১১.কিডনী অচল অবস্থায় দেহের রক্ত শোধন :
রোজাদারের কিডনি অচল হলে রোজা অবস্থায় প্রয়োজনে দেহের রক্ত পরিষ্কার ও শোধন করা বৈধ। পরিশুদ্ধ করার পর পুনরায় দেহে ফিরিয়ে দিতে যদিও রক্ত দেহ থেকে বের হয়, তবুও তাতে রোজার কোন ক্ষতি হবে না।
১২.আহারের কাজ দেয় না এমন (ওষুধ) ইনজেকশন ব্যবহার করা :
রোজাদারের জন্য চিকিৎসার ক্ষেত্রে সেই ইনজেকশন ব্যবহার করা বৈধ, যা পানাহারের কাজ করে না। যেমন, পেনিসিলিন বা ইনসুলিন ইনজেকশন অথবা অ্যান্টিবায়োটিক বা টনিক কিংবা ভিটামিন ইঞ্জেকশন অথবা ভ্যাকসিন ইনজেকশন প্রভৃতি হাতে, কোমরে বা অন্য জায়গায়, দেহের পেশী অথবা শিরায় ব্যবহার করলে রোজার ক্ষতি হয় না। তবুও নিতান্ত জরুরি না হলে তা দিনে ব্যবহার না করে রাত্রে ব্যবহার করাই উত্তম ও পূর্ব সাবধানতা মূলক কর্ম।
১৩.ক্ষতস্থানে ওষুধ ব্যবহার :
রোজাদারের জন্য নিউজ দেহের ক্ষতস্থানে ওষুধ দিয়ে ব্যান্ডেজ ইত্যাদি করা দর্শনীয় নয়। তাতে শেখ হত গভীর হোক অথবা অগভীর। কারণ, এ কাজকে না কিছু খাওয়া বলা যাবে, না পান করা। তাছাড়া ক্ষতস্থান স্বাভাবিক পানাহারের পথ নয়।
১৪.মাথা ইত্যাদির চুল কাটা:
রোজাদারের জন্য নিজ মাথার চুল বা নাভির নিচের লোম ইত্যাদি চাঁছা বৈধ। তাতে যদি কোন স্থান কেটে রক্ত পড়লেও রোজার কোন ক্ষতি হয় না। পক্ষান্তরে দাড়ি চাছা সবসময় কার জন্য হারাম; রোজা অবস্থায় অথবা অন্য কোন অবস্থায়।
১৫.কুলি করা ও নাকে পানি দেওয়া :
রোজাদারের ঠোঁট শুকিয়ে গেলে পানি দ্বারা ভিজিয়ে নেওয়া এবং মুখ বা জিভ শুকিয়ে গেলে কুলি করা বৈধ। অবশ্য গড়গড়া করা বৈধ নয়। আর এক্ষেত্রে মুখ থেকে পানি বের করে দেওয়ার পর ভেতরে পানির যে আদ্রতা বা স্বাদ থেকে যাবে, তাতে রোজার কোন ক্ষতি হবে না। কেননা, তা থেকে বাঁচা সম্ভব নয়।
১৬.সুগন্ধীর সুঘ্রাণ নেওয়া :
বলা বাহুল্য, রান্নাঘরে যে ধোয়া অনিচ্ছা সত্ত্বেও নাকে এসে প্রবেশ করে, তাতে রোজার কোন ক্ষতি হবে না। কারণ, তা থেকে বাঁচার উপায় নেই।
প্রকাশ থাকে যে নস্যি ব্যবহার করলে রোজা নষ্ট হয়ে যাবে। কারণ, তারক ঘনত্ব আছে এবং তার গুঁড়া পেটের ভিতর পৌঁছে থাকে। তাছাড়া তা মাদকদ্রব্যের শ্রেণীভুক্ত হলে ব্যবহার করা যেকোনো সময় এমনিতেই হারাম।
১৭.নাকে বা মুখে স্প্রে ব্যবহার :
স্প্রে দুই প্রকার ;প্রথম প্রকার হলো ক্যাপসুল স্প্রে পাউডার জাতীয়। দ্যা পিস্টলের মতো কোনো পাত্রে রেখে পুশ করে স্প্রে করা হয় এবং ধুলোর মতো উড়ে গিয়ে গলায় পৌছলে রোগী তা গিলতে থাকে। এই প্রকার স্প্রেতে রোজা নষ্ট হয়ে যাবে। রোজাদারকে যদি এমন স্প্রে বছরের সব মাসে এবং দিনেও ব্যবহার করতেই হয়, তাহলে তাকে এমন রোগী করা হবে, যার রোগ সারার কোনো আশা নেই। সুতরাং সে রোজা না রেখে প্রত্যেক দিনের বিনিময়ে একটি করে মিসকিন খাইয়ে দেবে।
ধৃতপোকার স্প্রে হলো বাষ্প জাতীয়। এই প্রকার স্পে তে রোজা ভাঙবে না। কেননা, তা পাকস্থলীতে পৌঁছে না। কারণ, তা হল একপ্রকার কম্প্রেসড গ্যাস ;যার ডিব্বায় প্রেসার পড়লে উড়ে গিয়ে (নিঃশ্বাসের বাতাসের সাথে) ফুসফুসে পৌঁছে এবং শ্বাসকষ্ট দূর করে। এমন গ্যাস কোন প্রকার খাদ্য নয়। আর রমাজান অরমজান এবং দিনে রাতে সব সময়ে (বিশেষ করে শ্বাসরোধ বা শ্বাসকষ্ট জাতীয় যেমন হাঁপানির রোগী) এর মুখাপেক্ষী থাকে।
অনুরূপভাবে মুখের দুর্গন্ধ দূরীকরণের উদ্দেশ্যে ব্যবহার্য স্প্রে রোজাদারের জন্য ব্যবহার করা দোষাবহ নয়। তবে শর্ত হলো, সেই স্প্রে পবিত্র ও হালাল হতে হবে।
১৮.রাস্তার ধুলা :
রাস্তার ধুলা রোজাদারের নিঃশ্বাসের সাথে পেটে গেলে রোজার কোন ক্ষতি হয় না। তেমনি ভাবে যে ব্যক্তি আটাচাকিতে কাজ করে অথবা তার কাছে যায় সে ব্যক্তির পেটে আটার গুঁড়ো গেলেও রোজার কোন ক্ষতি হবে না। কারণ, এসব থেকে বাঁচার উপায় নেই। অবশ্য মুখে মুখোশ ব্যবহার করে বা কাপড় বেঁধে কাজ করাই উত্তম।
১৯.থুথু ও গায়ের :
থুথু ও গয়ের থেকে বাঁচা দুঃসাধ্য। কারণ, তা মুখে বা গলার গোড়ায় জমা হয়ে নিচে এমনিতেই চলে যায়। অতএব এতে রোজা নষ্ট হবে না এবং বারবার থুথু ফেলার ও দরকার হবে না।
অবশ্য যে কফ, গয়ের, খাঁকার বা শ্লেষ্মা বেশি মোটা এবং যা কখনো মানুষের বুক (শ্বাসযন্ত্র) থেকে, আবার কখনো মাথা থেকে বের হয়ে আসে, তা গলা থেকে ছেড়ে বের করে বাইরে ফেলা ওয়াজেদ এবং তা গিলে ফেলা বৈধ নয়। যেহেতু তা ঘৃণিত;সম্ভবত : তাতে শরীর থেকে বেরিয়ে আসা কোন রোগ জীবাণু ও থাকতে পারে। সুতরাং তা গিলে ফেলাতে স্বাস্থ্যের ক্ষতিও হতে পারে। তবে যদি কেউ ফেলতে না পেরে গেলেই ফেলে, তাহলে তাতে রোজা নষ্ট হবে না।
পক্ষান্তরে মুখের ভেতরকার স্বাভাবিক লালা গিলাতে কোন ক্ষতি নেই। রোজাতেও কোন প্রভাব পড়ে না। এই লালা বের করে ফেলা জরুরী নয় ;এমনকি ফজরের আযানের সামান্য পূর্বে পানি পান করার পরেও নয়। কারণ, আমাদের জানামতে শাহাবা বর্গ কর্তৃক এমন কোন নির্দেশ বর্ণিত হয়নি, যাতে বুঝা যায় যে, রোজাদার ফজর উদয় হওয়ার একটু পূর্বে পানি পান করলে ততক্ষণ পর্যন্ত থুথু ফেলতে হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত জিভ থেকে পানির স্বাদ দূরীভূত না হয়েছে। বরং এতোটুকু অবশ্যই ক্ষমা যোগ্য। তবে হ্যাঁ, যদি কোন খাবারের স্বাদ ;যেমন খেজুর, চা বা অনুরোধ জাতীয় খাবারের মিষ্টতা জিবে অবশিষ্ট থেকে যায়, তাহলে তো অবশ্যই থুতু ফেলার সাথে (বা পানি দ্বারা কুলি করে) দূর করা জরুরী এবং সেহরির সময় শেষ হয়ে গেছে জানার পর তা গিলা বৈধ্য নয়।
দাঁতে লেগে থাকা গোশত বা অন্য কোন খাবার ফজর উদয় হওয়ার পরে অনিচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেললে, অথবা তা অতি সামান্য হওয়ার ফলে মুখে বুঝতে পারা বের করে ফেলা সম্ভব না হলে এর স্বাভাবিক লালার মতোই। তাতে রোজার কোন ক্ষতি হবে না। কিন্তু বেশি হলে এবং তা বের করে ফেলা সম্ভব হলে, বের করে দিলে আর কোন ক্ষতি হবে না। পড়ন্ত তাই ইচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেললে রোজা নষ্ট হয়ে যাবে।
২০.স্বামী স্ত্রীর সাধারণ মেলামেশা :
যে রোজাদার স্বামী-স্ত্রী মিলনে ধৈর্য রাখতে পারে ;অর্থাৎ সঙ্গম বা বীর্যপাত ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা না করে, তাদের জন্য আপোষে চুম্বন ও কোলাকুলি করা বৈধ এবং তা তাদের জন্য মকরূহ নয়।কারণ, মহানবী (সাঃ)- রোজা রাখা অবস্থায় স্ত্রী চুম্বন করতেন এবং রোজা অবস্থায় কোলাকুলিও করতেন। আর তিনি ছিলেন যৌন ব্যাপারে বড় সংযমী।অন্যের বর্ণনায় আছে যে, আল্লাহর রাসূল (সাঃ)- স্ত্রী চুম্বন করতেন রমজানে রোজা রাখা অবস্থায় ;রোজার মাসে।
আর এক বর্ণনায় আছে, হযরত আয়েশা (রাঃ)- বলেন, আল্লাহর রাসূল (সাঃ)- আমাকে চুম্বন দিতেন। আর সে সময় আমরা উভয় রোজা অবস্থায় থাকতাম।
পক্ষান্তরে রোজাদার যদি আশঙ্কা করে যে, কোলাকুলি বাঘ চুম্বনের ফলে তার বীর্যপাত ঘটে যেতে পারে অথবা উভয়ের উত্তেজনার ফলে সংসার মিলন ঘটে যেতে পারে, কারণ সে সময় সে হয়তো তাদের কাম -লালসাকে সংযত করতে পারবে না, তাহলে সে কাজ তাদের জন্য হারাম। আর তা হারাম এই জন্য যে, তাতে পাপের ছিদ্রপথ বন্ধ থাকে এবং রোজা নষ্ট হওয়া থেকে তারা রক্ষা পায়।
উপসংহার :
উপরোক্ত আজকের এই আলোচনা থেকে আশা করা যায় আপনারা, যে সকল বিষয়ে এতদিন জানতেন না অথবা জানলেও সঠিক ধারণা ছিল না তাদের একটু হলেও উপকারে আসবে ইনশাআল্লাহ। তাই আপনারা প্রত্যেকেই অথবা রমজানের পরেও এগুলো পুনরায় পড়ে নিজের জ্ঞান বৃদ্ধি করে নিতে পারেন।
“রোজা শুধু ক্ষুধা-তৃষ্ণা থেকে বিরত থাকা নয়; বরং তাকওয়া অর্জনের মাধ্যম। তাই সন্দেহজনক বিষয় এড়িয়ে চলাই মুত্তাকীর পথ।”



ড্রিমিক্স আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url